আমেরিকাতে স্কুলের নিয়ম-কানুন নিয়ে কিছু ধারাবাহিক তথ্য

bnews71.com

 

 

ফারজানা ফারজুঃ অনেক দিন থেকেই লিখবো লিখবো করেও যে লিখা হয়ে উঠছে না আজ তাই নিয়ে ভাবছি কিছু তথ্য তুলে ধরবার চেষ্টা করবো। বেশ কতো বছর স্কুলে কাজ করতে করতে যা বুঝতে পারলাম আর তা হলো- দেশ থেকে আসা পরিবারগুলোর বেশীর ভাগ সদস্যদেরই আমেরিকান স্কুল সম্বন্ধে ধারনা খুবই কম।

 

এলিমেন্টারী স্কুলঃ আমি যে স্কুলটাতে কাজ করি সেখানে এমপ্লয়ী হিসেবে বাঙ্গালী আমি একা হলেও প্রচুর ছাত্র-ছাত্রী আছে। অনেকেরই প্যারেন্টসদের জন্য ইন্টারপ্রেটারের প্রয়োজন হয় বলে প্রায় প্রতি ক্লাসের জন্যই অনেক সময় আমার ডাক পরে। এমন কি গাইডেন্স কাউন্সিলার, ফ্যামিলি ওয়ার্কার, পিটিএ ভর্তির ফর্ম ফিলাপে সাহায্য ( আজকাল যেহেতু অনেক কিছুই অন লাইনে হয় তাই সাহায্য লাগে)। এই কারণেও আমার হাজিরা দিতে হয়। আর এতে করে বুঝতে পারি শুধূ ভাষা আর স্কুলের নিয়মকানুন সম্বন্ধে তাদের জ্ঞান কম থাকায় তাদের বাচ্চাদের বিশেষ করে প্রি কে আর কিন্ডারে অনেক ঝামেলা হয়। বাচ্চারা অনেক সময় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে যে, তাদের বাসায় কল করে বাবা-মাকে অথবা কোন গার্জিয়ানের সাথে মিটিং করতে হয়।

 

দু’টো উদাহরণ দেই হাজারো ঘটনার মধ্যে ’’প্রচন্ড শীতের মধ্যেও বাচ্চাকে জুতার সাথে মা হয়তো মোজা না পরিয়েই স্কুলে পাঠালো। বেশ কয়েকদিন টিচার নোট দেয়ার পরেও কাজ হচ্ছে না । তখন আমাকে ডেকে বলা হলো মা’কে বুঝিয়ে বলতে। মা অথবা বাবাকে ফোন করে ডেকে আনালাম। সাথে সেই ক্লাসের টিচার মিটিং-এ মাকে যখন বললাম বাচ্চাকে কাল থেকে শীত, গ্রীস্ম সব সিজনেই জুতার সাথে এখানে মোজা পরিয়ে দেয়ার নিয়ম। মা বললো-বাচ্চা তো কথা শুনে না। সকালে উঠেই সব কিছু নিয়ে চেচামেচি করে আপা। সকালে উঠেই ফোন নিয়ে বসে গেইম খেলতে। ফোন নিতে গেলে এমনভাবে চিৎকার করে যে, ভয় লাগে পাশের বাসার মানুষ নাকি পুলিশ ডাকে। আর জোর করলে যদি বাচ্চা স্কুলে কমপ্লেইন করে তাহলে তো অনেক ঝামেলা হবে আপা। এই ভয়ে কিছু বলতেও পারি না । কি যে করি আপা আপনি বলেন কি করতে পারি? এক বন্ধুর মেয়ে তো স্কুলে নালিশ করবার পরে মেয়ে এখন ফস্টার কেয়ারে।”

 

 

আমার জানা মতে বেশ আগের একটি কাহিনী তুলে ধরলেই এই নিয়ে সবার ধারনা স্পষ্ট হয়ে উঠবে আশা করি। এক মেয়ে ( সেকেন্ড কি থার্ড গ্রেডের হবে) স্কুলে যাবার পরে যখন ক্লাসে যায় তার মন খুব খারাপ থাকাতে টিচার জিজ্ঞেস করে, “কি হয়েছে তোমার? হয়াই ইউ আর আপসেট? মেয়ে বলে- আই হেড রিয়েলি ব্যাড মর্নিং টুডে। মাই ড্যাড পুট হ্যান্ড অন মি (আমার খুব খারাপ সকাল ছিলো আজ। বাবা আমাকে মেরেছে) আর যায় কোথায়? সাথে সাথে এই ম্যাসেজ চলে যায় প্রিন্সিপালের কাছে, গাইডেন্স নিয়ে বাবা-মা’কে ডেকে আনা হয়। রিপোর্ট করা হয় সোসাল ওয়ার্কারের অফিসে। সেখান থেকে নানা ইনভেস্টিগেশনের মাধ্যমে ডিসিশন নেয়া হয় যে, তারা বাচ্চা জন্ম দিলেও বাবা মা হিসেবে এপ্রোপ্রিয়েট না । বাচ্চা পালবার ক্ষমতা তাদের নেই । সাথে সাথে আইন পাশ হলো এই বাচ্চা ফস্টারে দেয়া হবে । শুধূ এই মেয়েই না তার সাথে তার ছোটো বোন (ছয় বছর বয়স) তাকেও নিয়ে যাওয়া হলো।”

 

ফস্টার হলো এখানে যাদের বাচ্চা কাচ্চা নেই তারা এই ধরনের বাচ্চাদের পালক নেয়। আর নয়তো সরকারের মাধ্যমে এই ধরনের লাইসেন্সধারীরা অনেকগুলো বাচ্চা পালক নিয়ে তাদের এক সাথে বড় করে। স্কুল থেকে নিয়ে তাদের সমস্ত ভার নেয়া হয়। অনেক সময় সেখানে বিভিন্ন রকমের বাচ্চাদের সাথে মিশে ভালো মন্দ প্রভাবে প্রভাবিত হয়। ইচ্ছে করলে বাচ্চা যখন ১৮ বছরে পদার্পন করে তারা নিজেদের জীবন বেছে নিতে পারে, এমন কি বাবা মায়ের কাছে ফিরে আসতে পারে। কিন্তু আমার জানা মতে সেই মেয়েটি আর বাবা মায়ের কাছে কখনো ফিরে আসেনি। সে একটি বিদেশী ছেলেকেই বিয়ে করে হাই স্কুল শেষ না করেই।

 

 

কাজেই মা’টি ভয় পাওয়া অবাক হবার কিছু নেই। আমি বললাম ওর সাইকোলোজি বুঝে তাকে পরিচালনা করতে হবে। বিকেলে স্কুল থেকে গেলে পার্কে নিয়ে গেলে সে টায়ার্ড হয়ে বাসায় যাবে। বেশিক্ষন আর ফোন নিয়ে খেলবার এনার্জী থাকবে না। এরপর সন্ধায় হোম ওয়ার্ক করে রাতে ডিনারের পরে টিভিতে কার্টুন দেখিয়ে একটূ খেলতে দিয়ে ঘুমাতে দিলে, এভাবে নিয়ম করলে হয়তো কাজ হবে।

 

কিছুদিন পরে মা মিটিং ছাড়াই হয়তো বল্লো আপা একদম কথা শুনে না বাচ্চা আপনি একটু ভয় দেখাবেন? কি আর করা? ওর টিচারের সাথে আলাপ করে পিচ্চিকে হয়তো বললাম মায়ের কথা না শুনলে লাঞ্চের পরে যে অডিটোরিয়ামে নিয়ে দশ পনেরো মিনিট মুভী দেখানো হয় সে সময় ওকে প্রিন্সিপালের রূমে নয়তো অন্য ক্লাসে নিয়ে বসিয়ে রাখা হবে (নো ফান অনলি সিট)। কথায় কাজ না হলে সত্যিই যখন একদিন পানিশমেন্ট দেয়া হয় বাচ্চা শুর শুর করে মায়ের কথা শুনে । মায়ের সাথে দেখা হলে খুশীতে ঝলমল হয়ে উঠে। আপা আল্লাহ আপনার ভালো করবেন। অনেক বিপদ থেকে বাচাইছেন। এখন কথা না শুনলেই বলি দাড়া আপারে কল দেই। আর কিছু লাগে না। এভাবে কিছু সমস্যার সমাধান হলেও অনেক কিছু আছে যা তাদের নিজেদেরই শিখে নিতে হয়।

 

লেখকঃ ফারজানা ফারজু, নিউ ইয়র্ক, আমেরিকা। (পরিমার্জিত সংস্করন)