রিয়ার প্রতি সংবাদমাধ্যমের নিরপেক্ষহীনতার অভিযোগ

বিনোদন ডেস্ক : বলিউড অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুতের বান্ধবী ব্যাপকভাবে আলোচিত রিয়া চক্রবর্তীকে গ্রেপ্তার করেছে ভারতের মাদক নিয়ন্ত্রণ ব্যুরো এনসিবি। কিন্তু অভিনেত্রী রিয়া চক্রবর্তীকে ভারতের সংবাদমাধ্যম যেভাবে তাড়া করে বেড়াচ্ছে, হেনস্থা করেছে, যেভাবে তার দোষ প্রমাণিত হবার আগেই তাকে দোষী সাব্যস্ত করে ফেলেছে তা নিয়ে সমালোচনায় সোচ্চার হয়েছেন চলচ্চিত্র তারকারা। সংবাদমাধ্যমে, বিশেষ করে কিছু ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে রিয়া চক্রবর্তীকে নিয়ে যে ধরনের কভারেজ দেয়া হচ্ছে, তাতে সংবাদমাধ্যমের নিরপেক্ষতা যেমন প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে, তেমনই বিচারের দায়িত্ব সঙ্গতভাবে আইনের হাতে তুলে দিতে তাদের ব্যর্থতা নিয়ে তারা প্রশ্ন তুলেছেন।

বলিউড অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যুর তদন্তের অংশ হিসাবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রোববার ভারতের নারকোটিক কন্ট্রোল ব্যুরো এনসিবি যখন রিয়া চক্রবর্তীকে ডেকে পাঠায়, তখন তিনি সেখানে পৌঁছলে সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক হুড়োহুড়ি ও ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়। তিনি সাংবাদিকদের ঘেরাও-এর মধ্যে পড়ে যেভাবে হয়রানির শিকার হন তার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বলিউড তারকা ও চলচ্চিত্র নিমার্তারা রিয়া চক্রবর্তীর প্রতি ভারতীয় সাংবাদিকদের আচরণের বিরুদ্ধে সরব হন। এনসিবি দপ্তরের বাইরে করোনা আবহে সামাজিক দূরত্ব বজায় না রাখার এবং রিয়া চক্রবর্তীকে ধাক্কা দেওয়ার অভিযোগও ওঠে। এই ঘটনায় সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন জাতীয় মহিলা কমিশনের চেয়ারপার্সন রেখা শর্মাও।

সাংবাদিকতার পক্ষে একটা অশনিসঙ্কেত :- সুশান্তকে ১৪ই জুন মুম্বাইতে তার ফ্ল্যাটে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। পুলিশ বলে তিনি আত্মহত্যা করেছেন। সিবিআই রাজপুতের বান্ধবী রিয়া এবং তার পরিবার ও আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনা সহ ভারতীয় দণ্ডবিধির বেশ কয়েকটি ধারায় মামলা দায়ের করে। তিনি দোষী কিনা তা নিয়ে আদালতের বিচার এখনও শুরুই হয়নি। এমনকী তদন্তের কাজ যখন প্রাথমিক পর্যায়ে তখনই সুশান্ত সিং রাজপুতকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেবার দায়ে রিয়া চক্রবর্তীকে রীতিমতো দোষী বানিয়ে ফেলেছে সামাজিক মাধ্যমের পাশাপাশি এক শ্রেণির গণমাধ্যমও।

টেলিভিশনের উপস্থাপকরা তাকে ‘ধান্দাবাজ’ নারী বলে বর্ণনা করেছেন, যিনি ‘ডাইনি বিদ্যায় পারদর্শী’ এবং বলেছেন ‘সুশান্তকে তিনি আত্মহত্যায় প্ররোচনা দিয়েছিলেন।’ সিবিআই-য়ের হাতে এই মামলার তদন্তভার তুলে দেবার পর একটি টিভি চ্যানেলের সুপরিচিত একজন উপস্থাপক বলেন, ‘এটা ভারতের ইতিহাসে একটা অসামান্য মুহূর্ত’। টাইমস অফ ইন্ডিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকতা করছেন শিখা মুখার্জি। তিনি বলেছেন, তার চল্লিশ বছরের সাংবাদিক জীবনে তিনি টিভি চ্যানেলগুলোকে ‘এভাবে একজনকে দোষী প্রমাণ করার জন্য উঠে-পড়ে লাগতে দেখেননি’।

তিনি বলছেন প্রায় প্রতিদিন সংবাদ শিরোনাম হচ্ছেন রিয়া চক্রবর্তী। তার ব্যক্তিগত জীবন এবং প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে যাবতীয় ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয় চ্যানেলগুলো মানুষের সামনে তুলে ধরছে এবং সেসব নিয়ে টিভিতে প্রকাশ্যে কাটাছেঁড়া চলছে, সেগুলো মুখরোচক আলোচনা আর বিতর্কের বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে। যেখানে পুলিশ, সিবিআই এবং বিভিন্ন সংস্থা তদন্ত করছে, সেখানে সাংবাদিক হিসাবে আমার কাজ হবে তদন্তে কী বেরিয়ে আসছে তা রিপোর্ট করা। তা না করে চ্যানেলগুলো নিজেদের আঁচ অনুমান, বা শোনা কথার ভিত্তিতে তথ্য দিচ্ছে, নানা অভিযোগ এনে সাজিয়ে গুছিয়ে এমনভাবে তথ্য পরিবেশন করছে যাতে মনে হবে সুশান্তের মৃত্যুর জন্য রিয়াই দায়ী। আমি বলব চ্যানেলগুলো খুবই ম্যানিপুলেটিভ কভারেজ দিচ্ছে, মানুষকে ভাবতে প্রভাবিত করছে যে রিয়া দোষী। এটা তো সংবাদ মাধ্যমের কাজ হতে পারে না, বলছেন শিখা মুখার্জি।

তিনি বলছেন রিয়া চক্রবর্তী যদি দোষী হয়, সেটা তদন্তের ভিত্তিতে আদালতে প্রমাণিত হতে হবে। আনন্দবাজার পত্রিকা অনলাইনের সম্পাদক অনিন্দ্য জানা বলেছেন রিয়া চক্রবর্তীকে দোষী প্রমাণিত করার মধ্যে দিয়ে কিছু টিভি চ্যানেল তাদের রাজনৈতিক প্রভুদের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করছে। সামনে বিহারের নির্বাচন এবং সুশান্ত সিং রাজপুত বিহারের ভূমিপুত্র। বিহারের ক্ষমতাসীন দল কেন্দ্রে বিজেপির শরিক এবং সেখানে নির্বাচনী প্রচারে রাজপুতের মৃত্যুর ঘটনাকে ব্যবহার করা হচ্ছে, বলছেন অনিন্দ্য জানা। -এক শ্রেণির সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত কদর্য, বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।

তিনি বলছেন, রিয়া চক্রবর্তী দোষী কি দোষী না সেটা তদন্তসাপেক্ষ। কিন্তু উইচহান্ট করে সেটা যেভাবে মিডিয়া ট্রায়ালের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, সেটা সাংবাদিকতার পক্ষে একটা অশনিসঙ্কেত। যেটা পদ্ধতিগতভাবে ঘটছে সেটা রিপোর্ট করা সাংবাদিকের কাজ, তিনি বলছেন। কিন্তু যেটা আপত্তিজনক, সেটা হল তদন্তকে কোনও একটা পথে ঠেলে নিয়ে যেতে জেনেশুনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা। খানিকটা নীতিনৈতিকতা রেখে খবরকে খবর হিসাবে তুলে ধরার যে সাংবাদিকতা, রিয়া চক্রবর্তীর খবর নিয়ে সংবাদমাধ্যমের আচরণ সেই সাংবাদিকতার জন্য শুভ সংবাদ বহন করে আনছে না। অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইতিমধ্যেই রিয়া চক্রবর্তীকে ‘স্বার্থান্বেষী’, ‘মাফিয়া চক্রের হোতা’ এবং ‘ধনী পুরুষ ধরার যৌন ছিপ’ বলে তকমা দিয়েছে।